জুয়ার বিশেষজ্ঞরা কীভাবে কোগনিটিভ বিহেভিওরাল থেরাপি প্রয়োগ করেন?

জুয়ার বিশেষজ্ঞরা কোগনিটিভ বিহেভিওরাল থেরাপি (সিবিটি) প্রয়োগ করেন মূলত জুয়ার আসক্তিতে আক্রান্ত ব্যক্তির চিন্তাভাবনা (কগনিশন) এবং আচরণ (বিহেভিয়ার) পুনর্নির্দেশ করার মাধ্যমে। তাদের কাজটি শুরু হয় একটি গভীর মূল্যায়ন দিয়ে, যেখানে তারা রোগীর জুয়ার ইতিহাস, ট্রিগার পরিস্থিতি, জুয়ার পরে অনুভূত emotions এবং আর্থিক ক্ষতির পরিমাণ বিশদভাবে বোঝার চেষ্টা করেন। উদাহরণস্বরূপ, একজন রোগী যদি প্রতিদিন সন্ধ্যায় একাকিত্ব বোধ করলে অনলাইন স্লট গেম খেলতে শুরু করেন, বিশেষজ্ঞ প্রথমে এই প্যাটার্নটি চিহ্নিত করেন। এরপর তারা সিবিটির কাঠামোতে নিম্নলিখিত ধাপগুলো অনুসরণ করেন।

প্রথম ধাপ হলো চিন্তার বিকৃতি চিহ্নিতকরণ এবং চ্যালেঞ্জ করা: জুয়ার আসক্ত ব্যক্তির মস্তিষ্কে কিছু স্বয়ংক্রিয় নেতিবাচক চিন্তা কাজ করে, যেমন “আমি নিশ্চিত এবার জিতব,” “হারানো টাকা ফেরত পেতে হলে আবার খেলতেই হবে,” বা “লাক আমার সাথে আছে।” জুয়ার বিশেষজ্ঞ রোগীকে শেখান কিভাবে এই “কগনিটিভ ডিসটরশনস” বা চিন্তার বিকৃতিগুলোকে চিনতে হবে এবং যুক্তি দিয়ে তাদের মিথ্যা প্রমাণ করতে হবে। তারা রোগীকে একটি “চিন্তার ডায়েরি” রাখতে বলেন, যেখানে প্রতিবার জুয়ার ট্রিগার হওয়ার সময় কী চিন্তা মাথায় আসে তা লিখে রাখতে হয়। তারপর থেরাপি সেশনে, তারা যৌথভাবে সেই চিন্তাগুলো বিশ্লেষণ করেন। যেমন, “লাক আমার সাথে আছে” এই বিশ্বাসটিকে তারা পরিসংখ্যান দিয়ে ভাঙেন – একটি স্লট মেশিনের RTP (রিটার্ন টু প্লেয়ার) যদি ৯৬% হয়, তাহলে দীর্ঘমেয়াদে মেশিনটিই জিতবে, এটি একটি গাণিতিক সত্য।

দ্বিতীয় ধাপে আসে আচরণগত কৌশল রপ্তানি: এখানে বিশেষজ্ঞরা রোগীকে ব্যবহারিক কৌশল শেখান যা সরাসরি জুয়ার আচরণ নিয়ন্ত্রণ করে। এর মধ্যে রয়েছে:

১. ট্রিগার এড়ানো: যদি কোনো নির্দিষ্ট বার বা বন্ধুর সংস্পর্শ জুয়ার ইচ্ছা জাগায়, তাহলে সেসব পরিস্থিতি এড়িয়ে চলার পরিকল্পনা করা।
২. বিকল্প কার্যকলাপ খোঁজা: জুয়ার ট্রিগার হলে তার বদলে অন্য কিছু করা, যেমন হাঁটতে যাওয়া, বই পড়া বা পরিবারের সাথে সময় কাটানো।
৩. আর্থিক নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা: বিশেষজ্ঞরা প্রায়শই পরিবারের সদস্যদের সাথে কথা বলে রোগীর ব্যাংক অ্যাকাউন্টে নিয়ন্ত্রণ আরোপ করতে সহায়তা করেন, যাতে সহজে জুয়ার জন্য টাকা পাওয়া না যায়।

একটি গুরুত্বপূর্ণ কৌশল হলো “ডিসিশনাল বালান্স শীট” ব্যবহার করা, যেখানে রোগী জুয়া খেলার ভালো ও খারাপ দিকগুলো লিখে দেখেন। এটি করতে গিয়ে তিনি নিজেই উপলব্ধি করেন যে খারাপ দিকগুলো (আর্থিক ক্ষতি, সম্পর্কের অবনতি, মানসিক চাপ) ভালো দিকগুলোর (ক্ষণিকের উত্তেজনা) চেয়ে অনেক বেশি ভারী।

তৃতীয় ধাপটি হলো রিল্যাপস প্রতিরোধ পরিকল্পনা: সিবিটি কেবল বর্তমান সমস্যা নয়, ভবিষ্যতের ঝুঁকিও মোকাবেলা করে। বিশেষজ্ঞ রোগীর সাথে মিলে একটি বিস্তারিত পরিকল্পনা তৈরি করেন যা将来 জুয়ার ইচ্ছা ফিরে এলে কী করবেন তা বলে দেয়। এই পরিকল্পনায় থাকতে পারে একজন বিশ্বস্ত ব্যক্তির ফোন নম্বর, জরুরি অবস্থায় করণীয় ধাপসমূহ, এবং পূর্বে শেখানো কৌশলগুলোর স্মারক।

সিবিটি’র সাফল্য পরিমাপের জন্য বিশেষজ্ঞরা নির্দিষ্ট মাপকাঠি ব্যবহার করেন। নিচের সারণিটি একটি ধারণা দেয়:

মাপকাঠিথেরাপি শুরুর আগেথেরাপি শেষে (১২ সপ্তাহ পর)ডেটা উৎস
সাপ্তাহিক জুয়ায় ব্যয় (টাকায়)৫,০০০ টাকা৫০০ টাকাআত্ম-রিপোর্ট ও ব্যাংক স্টেটমেন্ট
জুয়ার তাগিদের তীব্রতা (১-১০ স্কেলে)মানসিক মূল্যায়ন স্কেল (PGSI)
জুয়া-সংক্রান্ত নেতিবাচক চিন্তার ফ্রিকোয়েন্সিসপ্তাহে ১৫-২০ বারসপ্তাহে ২-৩ বারচিন্তার ডায়েরি

গবেষণা থেকে প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, যারা সিবিটি সম্পন্ন করেন তাদের প্রায় ৭০% থেরাপি শেষে জুয়ার আচরণে উল্লেখযোগ্য উন্নতি দেখান। এটি শুধু জুয়া বন্ধ করাতেই সাহায্য করে না, অন্যান্য সমস্যা যেমন হতাশা এবং উদ্বেগও কমাতে ভূমিকা রাখে, কারণ এই সমস্যাগুলো প্রায়শই জুয়ার আসক্তির সাথে সম্পর্কিত। থেরাপির পাশাপাশি, কিছু জুয়ার বিশেষজ্ঞ স্ব-সহায়ক গ্রুপে যোগদানের পরামর্শ দেন, যেখানে সদস্যরা একে অপরের অভিজ্ঞতা ও সমর্থন ভাগ করে নেন, যা পুনর্বাসন প্রক্রিয়াকে আরও শক্তিশালী করে।

চিকিৎসার বাইরেও, বিশেষজ্ঞরা সামাজিক দায়বদ্ধতার অংশ হিসেবে সচেতনতা তৈরি করতে কাজ করেন। তারা কমিউনিটিতে গিয়ে জুয়ার আসক্তির লক্ষণগুলো সম্পর্কে মানুষকে শিক্ষা দেন, যেমন টাকা ধার করা, জুয়ার বিষয়ে মিথ্যা বলা, এবং জুয়া নিয়ন্ত্রণ করতে না পারা। তারা স্কুল ও কলেজের ছাত্রছাত্রীদের জন্য প্রিভেনশন প্রোগ্রামও চালান, যেখানে তরুণদের জুয়ার ঝুঁকি ও এর ফলাফল সম্পর্কে আগে থেকেই জানানো হয়, যাতে তারা ভবিষ্যতে এই আসক্তির শিকার না হয়। এই সমন্বিত প্রয়াস – ব্যক্তিগত থেরাপি, গ্রুপ সাপোর্ট এবং কমিউনিটি আউটরিচ – জুয়ার আসক্তি মোকাবেলায় কোগনিটিভ বিহেভিওরাল থেরাপিকে একটি অত্যন্ত কার্যকর হাতিয়ারে পরিণত করেছে।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *